সুন্দরবনের প্রাণ সুন্দরী গাছের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। নতুন এক বাস্তুসংস্থান জরিপে দেখা গেছে, বনের আনুমানিক ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছে 'টপ-ডাইং' বা মাথা-শুকনো রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যা মোট সুন্দরী গাছের প্রায় ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২ কোটি ২৪ লাখ গাছ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণায় ১৯৮৬ সাল থেকে চালু থাকা ১২০টি স্থায়ী জরিপ প্লটের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার ফল গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বন অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা গেছে, মারাত্মকভাবে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ১৯৮৬ সালের ১ কোটি ১৯ লাখ থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ গাছে সংক্রমণ ২৫ শতাংশের কম, আর ২ কোটি ৫১ লাখ গাছে ক্ষতি ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ক্ষতি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্তম, কাগা দোবেকি ও গেওয়াখালী এলাকায়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো নতুন চারার সংকট। ১৯৮৬ সালে প্রতি হেক্টরে সুন্দরীর চারা ছিল ২ হাজার ৬৮৯টি, ২০২২ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৭৭৬টিতে। অর্থাৎ পুরোনো গাছ মরছে, কিন্তু সেই জায়গা পূরণের মতো তরুণ গাছ বাড়ছে না। তিন দশকে বনের ভূ-উপরস্থ জৈবভরও কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পলি জমে খাল ভরাট, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন এবং পরজীবী উদ্ভিদের বিস্তার—সব মিলিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের কোথাও কোথাও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে পরজীবী লতা ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন বন কর্মকর্তারা।
বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. জাহিদুল কবির জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের (কপ-১৭) ফাঁকে বিষয়টি তুলে ধরে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন। জেলেদের পর্যবেক্ষণেও এই পরিবর্তন ধরা পড়েছে—খুলনার কয়রার জেলে ইসলাম সানার ভাষায়, পাঁচ-ছয় বছর আগেও যেখানে ঘন সুন্দরীর জঙ্গল ছিল, এখন তা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। এদিকে ভোলা নদীর পলি খনন করে মিঠাপানির প্রবাহ ফেরানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর—মিঠাপানির প্রশ্নটি তাই কূটনৈতিক আলোচনার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।