ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পানি এতটাই দূষিত যে দেশি প্রজাতির মাছ সেখানে প্রায় টিকতেই পারছে না। অথচ সেই নদীতেই এখনো বেঁচে আছে প্রায় ২০টি বিপন্ন গঙ্গা শুশুক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব এশিয়া-প্যাসিফিক বায়োডাইভারসিটিতে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা ১২ মাস ঢাকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ২৭ কিলোমিটার অংশজুড়ে জরিপ চালান গবেষকেরা। জরিপের ১২ মাসের মধ্যে ১০ মাসেই ডলফিনের দেখা মিলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, টিকে থাকার কৌশল হিসেবে শুশুকদের আচরণেও বদল এসেছে—আগে এরা সাধারণত একা চলাফেরা করলেও এখন দলবেঁধে ঘুরছে; জরিপে পাওয়া ডলফিনের ৮০ শতাংশের বেশি ছিল দলবদ্ধ, প্রতি দলে গড়ে ৪টির বেশি। রেকর্ড করা ডলফিনের প্রায় ১৬ শতাংশ বাচ্চা, যা প্রমাণ করে এই প্রতিকূল পরিবেশেও এদের প্রজনন বন্ধ হয়নি।

গবেষকদের মতে, দেশি মাছের সংকটে শুশুকরা এখন খাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে দূষণসহিষ্ণু বিদেশি ‘সাকার ফিশ’। কিন্তু এই টিকে থাকা কোনোভাবেই নদীর সুস্থতার লক্ষণ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের গড় পরিমাণ লিটারপ্রতি মাত্র ১ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম, কোথাও কোথাও তা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি—অথচ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকতে কমপক্ষে ৪ মিলিগ্রাম প্রয়োজন। শিল্পের বর্জ্য নদীতে পড়ছে ৫৭টি পয়েন্ট দিয়ে।

প্রায় দৃষ্টিহীন শুশুক শব্দের প্রতিধ্বনি বা ইকোলোকেশনের ওপর নির্ভর করে পথ চলে ও শিকার ধরে। কিন্তু সদরঘাট এলাকায় প্রতিমাসে ৬৬৫টির বেশি ভারী জলযান চলাচল করায় যেসব অংশে নৌযানের শব্দ বেশি, সেখানে ডলফিনের উপস্থিতি প্রায় শূন্য। জরিপে ডলফিনের ঘনত্ব পাওয়া গেছে মূলত তিনটি গভীর অংশে—বসিলায় সবচেয়ে বেশি, এরপর ঘাটারচর ও কামরাঙ্গীরচরে। কিলোমিটারপ্রতি ডলফিনের দেখা মেলার হার এখন শূন্য দশমিক ১৮, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

গবেষকরা খোলামোড়া-বসিলা ও পাগলা-ফতুল্লা মোহনা এলাকাকে অবিলম্বে ‘ডলফিন সংরক্ষিত এলাকা’ ঘোষণার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি সংরক্ষিত অংশে নৌযানের গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারের নিচে রাখা এবং ৫৭টি বর্জ্য নিষ্কাশন পয়েন্টে ইটিপি চালু করে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। অধ্যাপক আজিজ বলেন, বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করা না গেলে এই শুশুকগুলো বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না।