চোয়ালের গুরুতর আঘাত নিয়ে উদ্ধার হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং কলার পরিয়ে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়েছে ‘অ্যালফি’ নামের একটি পুরুষ মেছোবিড়ালকে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি চা-বাগান এলাকায় অবমুক্ত করা প্রাণীটির চলাচল পর্যবেক্ষণ করে এর অভিযোজন ও বিচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন গবেষকেরা।

দ্য ডেইলি স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে মেছোবিড়ালটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। পরে তাকে নেওয়া হয় জানকীছড়া ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে। উদ্ধারের সময় প্রাণীটির ওজন ছিল মাত্র পাঁচ কেজি। চোয়ালে গুরুতর আঘাতের কারণে সে ঠিকমতো খাবার খেতে পারছিল না।

জানকীছড়া কেন্দ্রে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের (সিসিএ) দলের তত্ত্বাবধানে প্রাণীটির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন চলে। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে তার ওজন বেড়ে ১২ কেজির বেশি হয়।

প্রকৃতিতে ফেরানোর আগে অ্যালফিকে উত্তরভাগ ও ইন্দানগর চা-বাগান এলাকায় নির্মিত একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রিত বেষ্টনীতে আট সপ্তাহ রাখা হয়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘সফট রিলিজ’। এর উদ্দেশ্য হলো, অবমুক্তির আগেই প্রাণীটিকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীকে অপরিচিত এলাকায় ছেড়ে দিলে কখনো কখনো তারা পরিচিত এলাকায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ সময় সড়ক, জনবসতি ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। অ্যালফিকে নির্দিষ্ট এলাকায় আট সপ্তাহ রাখার মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কমানো এবং নতুন আবাসস্থলের সঙ্গে তার পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

অবমুক্তির আগে অ্যালফির গলায় পরানো হয় ২০০ গ্রাম ওজনের একটি স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং কলার। প্রাণীটির ওজনের তুলনায় কলারটির ওজন দুই শতাংশেরও কম। এরপর তাকে চা-বাগানের ভেতরেই অবমুক্ত করা হয়। আশপাশের জলাভূমিগুলো মেছোবিড়ালের বিচরণের উপযোগী আবাসস্থল।

স্যাটেলাইট কলারের মাধ্যমে গবেষকেরা অবমুক্তির পর অ্যালফির চলাচল ও বিচরণক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। চা-বাগান ও আশপাশের জলাভূমির মতো মানুষের কার্যক্রম থাকা এলাকায় প্রাণীটি কীভাবে চলাফেরা করে, কোথায় অবস্থান করে এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নেয়, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

জলাভূমিনির্ভর মেছোবিড়াল আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বিভিন্ন হুমকির মুখে রয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চা-বাগান ও আশপাশের জলাভূমি এ প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র।

এ ধরনের এলাকায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে চা-বাগান কর্তৃপক্ষের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যালফির গতিবিধি থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে চা-বাগান ও মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকায় মেছোবিড়ালের সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

এই উদ্যোগে বাংলাদেশ বন বিভাগ, উত্তরভাগ ও ইন্দানগর চা-বাগান, জাপানের রিতসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়, স্কোপ ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট ফিশিং ক্যাট এবং ফিশিং ক্যাট কনজারভেশন অ্যালায়েন্স যৌথভাবে কাজ করেছে।

অ্যালফির পুনর্বাসন ও অবমুক্তির এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রাণীকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে অবমুক্ত বন্যপ্রাণীর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও এগিয়ে যাচ্ছে।